আনোয়ারুল ইসলাম, দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি:
দিনাজপুরের পার্বতীপুরে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত পরিচয় তরুনী লাশের পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশ। এছাড়াও তার মৃত্যুর জন্য দায়ী কথিত প্রেমিকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে পার্বতীপুর মডেল থানা পুলিশ।

হত্যার মুল পরিকল্পনাকারী হিসেবে আনিছুল রহমান (২৮), অটোচালক রাজ মিয়া (২৫) ও আশিকুজ্জামান (৪০) কে অাজ বুধবার ভোরে নিজ বাড়ি থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। অাজ বুধবার বিকেলে ১৬৪ ধারায় স্বীকারাক্তিমুলক জবানবন্দি নেওয়ার জন্য দিনাজপুর বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালতে হাজির করা হয়। এ ঘটনায় গত মঙ্গলবার গ্রাম পুলিশ আব্রাহাম মিনজী পার্বতীপুর মডেল থানায় বাদী হয়ে ৩০২/২০১/৩৪ দন্ডবিধি ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-৭) রংপুরের বদরগঞ্জের রুখিয়া রাউত (২৩) নামে ক্ষুদ্র নৃ-গাষ্ঠির (আদিবাসী) এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর নির্দয়ভাব হত্যার অভিযাগ পাওয়া গেছে।

গত মঙ্গলবার ভোরে পার্বতীপুর মধ্যপাড়ায় ফুলবাড়ী-রংপুর আঞ্চলিক মহাসড়কর পাশের শালবাগান থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় অজ্ঞাত হিসেবে লাশটি উদ্ধার করা হয়। সে রংপুর কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অনার্স ইতিহাস বিভাগর শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের মিশনপাড়ার ক্ষুদ্র-নৃ গাষ্ঠির দিনেশ রাউত ও মিনতির এর মেয়ে। পারিবারিক সুত্রে জানা যায়, গত সোমবার (৫ অক্টাবর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রংপুর যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হন রুখিয়া।

বান্ধবীদর সঙ্গে একরাত থেকে পরের দিন তার ফিরে আসার কথা ছিল। শেষ বার ফোন মা সুমতিকে বলে যায় ‘মা রংপুর যাছি। চিন্তা করিস না। সকালে আবার ফিরে আসবো।’ এরপর থেকে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ওইদিন সে আর বাড়িতে ফিরে না আসল উদ্বিগ হয় পড়েন পরিবারের লোকজন। অবশেষে পরের দিন মঙ্গলবার ভোরে পার্বতীপুর উপজলার হরিরামপুর ইউনিয়নর পাঁচপুকুরিয়ার শালবাগান থেকে অজ্ঞাত একটি লাশটি উদ্ধার করে মধ্যপাড়া পুলিশ ফাঁড়ি। উদ্ধারের সময় নিজের ওড়না দিয়ে তার হাত-পা গলায় সঙ্গে বাধা ছিল। পরনে ছিল সালায়ার কামিজ। মুখের দাঁতগুলা ভাঙ্গে দেয় দুর্বত্তরা। রক্তাক্ত ও ক্ষত-বিক্ষত ছিল মুখ। দুর্বত্তরা নির্দয়ভাব হত্যার পর অটোচালিত গাড়ীতে করে সেখান লাশটি ফেলে যায়। পরে মধ্যপাড়া পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে মঙ্গলবার বিকেলে ময়না তদন্তের জন্য দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালর মর্গে পাঠায়।

এদিকে, লাশের পরিচয় জানতে ওইদিন সন্ধ্যায় দিনাজপুর পুলিশ ব্যুরা অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) একটি তদন্ত দল মৃতের হাতের আঙ্গুলের ছাপ নেয়। এতে তারা জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে চেহারার ছবি মিলে যাওয়ায় তার পরিচয় নিশ্চিত হন। পরে জানতে পারেন সে ক্ষুদ্র নৃ-গাষ্ঠি পরিবারর মেয়ে। তার বাড়ি বদরগঞ্জ।

রুখিয়ার বাবা দিনেশ রাউত বলেন, একই এলাকার আব্দুল গফুরের ছেলে আনিছুল রহমান প্রায় সময় রুখিয়াকে উত্যক্ত-বিরক্ত করতো। হোস্টেল থেকে বাড়িতে আসলে সে নানাভাবে বিরক্ত করতো আমার মেয়েকে। এক পর্যায় সে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। গত সোমবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে রুখিয়া তার ডায়েরিতে লিখে গেছে ‘আত্মহত্যা করতে গিয়ে কোনভাবে বেঁচে গেলাম। আজ ৫/১০/২০২০ আমাকে আনিছুল রহমান দূরে কোথাও ডাকছে। যেখানে ও নিজের হাতে আমাকে হত্যা করবে। এ কথা ও নিজ বলেছে ও আমাকে নিজের হাতে হত্যা করবে। আমার সবকিছুর জন্য আনিছুল দায়ী।’ বাড়ি থেকে যাওয়ার কোন এক সময় রুখিয়া ডায়রিতে এসব লিখে রাখে। পড়ার টবিল থেকে রুখিয়ার ডায়রি উদ্ধার করে এসব তথ্য পাওয়া যায়।

বদরগঞ্জ উপজলা ক্ষুদ্র নৃ-গাষ্ঠি সমাজ উন্নয়ন সমিতির সভাপতি শ্যামল টুডু বলেন, ‘অতিদ্রুত সময়ের মধ্য এ হত্যাকাণ্ডর সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি চাই। তা না হলে বৃহৎ আন্দোলন গড়ে তোলা হব।’ জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবিন্দ্র সরেন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে অাদিবাসী নারী নির্যাতন, নিপীড়ন ধর্ষণ ও অাদিবাসীদের জমি বেদখলের যে সব ঘটনা ঘটেছে। এতে জড়িতদের দৃষ্টান্ত শাস্তির দাবী জানাছি।

পার্বতীপুরর মধ্যপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সিরাজুল ইসলাম জানান, নির্দয়ভাব মেয়েটিকে হত্যার পর লাশ ফেলে যায়। এ ঘটনায় সন্দেভাজন আনিছুল হক নামে একজনকে আটক করা হয়েছে। এতে আরো কেউ জড়িত আছে কিনা তা জানতে তদন্ত চলছে। দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মডিক্যাল কলজ হাসপাতাল মর্গে লাশের ময়না তদন্ত শেষে পরিবারর কাছ হস্তান্তর করা হয়েছে। পার্বতীপুর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সোহেল রানা বলেন, তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। আলামত হিসেবে বেশকিছু জিনিসপত্র তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *