মুমুর্ষু রোগীর আহাজারি তো অনেক শুনি কিংবা টিভির পর্দায় হাজারো গল্প নিজ চোখে দেখা হয়।তবে নিজ চোখে সরাসরি খুব একটা দেখা হয়নি।বয়স স্বল্পতার কারণে তা সম্ভবও হয়ে উঠেনি।গত কয়েকদিন আগে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে গিয়েছিলাম। যার সুবাদে রোগীদের আহাজারি নিজ চোখে দেখার ইচ্ছেটা পূর্ণ হয়েছিল।

দাদু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়াতে তড়িঘড়ি করে গাড়ি নিয়ে টেকনাফ থেকে কক্সবাজার হাসপাতালে গিয়েছিলাম।একটা প্রাইভেট হাসপাতালে ডাক্তার দেখানোর পর ডাক্তার আমার দাদুকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি দেওয়ার পরামর্শ দেন।ডাক্তার পরামর্শ অনুযায়ী আমি ও দাদুকে সদর হাসপাতালের গেইটে নিয়েছিলাম।যখনি হাসপাতালে ঢুকতে যাব তখন পিছন থেকে সিকিউরিটি ডাক দিয়ে বলে টিকেট নিয়েছেন কি?কৌতুহল বসত জিজ্ঞেস করলাম,রোগীর অবস্থাতো খারাপ এখন আবার টিকেট নিয়ে টানাটানি কেন?উত্তরে বলে উঠলো, টিকেট ছাড়া হাসপাতালে প্রবেশ করা যাবেনা।তার কথা মতো ৫ টাকা দিয়ে একটা টিকেট নিয়ে ঢুকতে যাচ্ছিলাম তখনই সিকিউরিটি আবার বলে ডাক্তার দেখার জন্য আরেকটা টিকেট প্রয়োজন।আমি বললাম,আচ্ছা আরেকটা টিকেট নিচ্ছি ১০ টাকা দিয়ে টিকেট নেওয়ার পর ডাক্তার দেখালাম।ডাক্তার ভর্তি দিল। এখন আবার টিকেটের পালা।ভর্তির জন্য আবারো ১০ টাকা দিয়ে টিকেট কিনলাম।

টিকেট নিয়ে চতুর্থ তলায় যাওয়ার নির্দেশ দেন ডাক্তার। যাওয়ার পর মহিলা কেবিনে আমার দাদুকে ভর্তি করালো।এবার আসলো আরেক বিপদ।সিট ম্যানেজ করতে হবে।আপাতত দাদুকে একটা জায়গায় বসিয়ে ওয়ার্ড কর্মচারী কে সিটের ব্যাপারে জানালাম।সে একটা সিট ম্যানেজ করে দিল।তবে আমার ভাগ্য খুবই ভালো, অনেকেই সিট পায়না।ওয়ার্ড কর্মচারীদের কিছু টাকা দিলে কিন্তু সিট মিলে যায়।যা আমার সামনেও কয়েকবার ঘটে গেল।

সিট নিয়ে দাদুকে শুয়ে দিয়ে আবার ডাক্তার নিয়ে টানাটানি। ট্রিটমেন্ট দেওয়ার জন্য নার্স ডাকতে হলো।নার্স দাদুকে ট্রিটমেন্ট দেওয়ার সময় হঠাৎ আমার নজর গেল পাশের সিটে।১৪ নাকি ১৫ বছরের একটা মেয়ে বারবার চিৎকার দিয়ে ওঠে। কৌতুহল বসত জানতে চায়লাম তার কি হলো।তার একজন অবিভাবক বলল,সে নাকি বিষ পান করেছে।অল্প বয়সে বিয়ে দিতে চাওয়াতে আত্মহত্যা কর‍তে চেয়েছিল।

হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে প্রায় তিন দিন আগে।পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে এখনো সুস্থ হতে পারছেনা।প্রাইভেট হাসপাতালে যেখানে তাৎক্ষণিকভাবে উন্নতমানের চিকিৎসা পাওয়া যায় সেখানে তিন -চার দিন পরেও সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা মেলেনা।

দিনে ডাক্তার আসে একবার।সকাল ৮ টার দিকে ডাক্তাররা এসে দেখে গেল প্রতিটা রোগীকে।কি দেখে বা কেমন দেখে আমি জানিনা।এসে শুধু ফাইলটা চেক করে তারপর কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে চলে যায়।সারাদিন কোন খোজ খবর থাকেনা।দুই বার নার্স এসে ওষুধ বা ইঞ্জেকশন দিয়ে যায়।ডিউটি ডাক্তার ২৪ ঘন্টা থাকলেও তারা তাদের রুমে সীমাবদ্ব

একটা সরকারি হাসপাতালের অবস্থা যদি এটা হয়,যদি একজন রোগীর চিকিৎসা পেতে এত সময় লাগে বা রোগীকে এন্ট্রি করাতে দৌড়াদৌড়ি করে দুই তিন জায়গা থেকে টিকেট নিয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করা লাগে তাহলে মানবতা নামক জিনিসটা আজ কোথায়?যাদের ধনসম্পদ আছে তারা হয়তো প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারে কিন্তু গরীব-দুঃখী মানুষের তো সরকারি হাসপাতালেরই সেবা গ্রহণ করতে হয়।তাদেরও বাঁচার অধিকার আছে।

লেখকঃ আব্দুল্লাহ আল নোমান

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *